
ডেস্ক: যে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে ৫০ ওভারের বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে ভারতের বুক ভেঙেছিল। ঠিক সেই মাঠেই নিউ জিল্যান্ডকে ৯৬ রানে হারিয়ে ২০ ওভারের বিশ্বকাপ জিতল টিম ইন্ডিয়া।
মহেন্দ্র সিং ধোনি ও রোহিত ও শর্মার পর সূর্যকুমার যাদব ভারতের তৃতীয় অধিনায়ক হিসেবে টি-২০ বিশ্বকাপ জিতলেন। আর ধোনি-রোহিত মাঠে বসে তা দেখলেন। আর সঙ্গে ছিলেন দেশের প্রথম বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক কপিল দেবও । দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নামাঙ্কিত স্টেডিয়ামে ভারত ভুবনজয়ী হল। মোদী এক্স হ্যান্ডেলে ভারতীয় দলকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। শুভেচ্ছাবার্তা এসেছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফেও…
বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ভারত শুধু ব্যাক-টু-ব্যাক টি-২০ বিশ্বকাপই জিতল না, ভারতই একমাত্র দেশ হিসেবে তিনবার ক্রিকেটের ক্ষুদ্রতম সংস্করণে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করল। ইতিহাস বলছে এর আগে কোনও দেশ টি-২০ বিশ্বকাপ আয়োজন করে আজ পর্যন্ত জেতেনি। সেই ইতিহাসকেই হারিয়ে ভারত নতুন ইতিহাস লিখল। কাপযুদ্ধের স্লোগান ছিল ‘ডিফিট হিস্ট্রি, রিপিট হিস্ট্রি’, চরিতার্থ হল এবার। ভারত বুক ফুলিয়ে বলবে, ‘হিস্ট্রি রিপিটেড, হিস্ট্রি ডিফিটেড’… কোচ গৌতম গম্ভীর গতবছর ভারতকে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতিয়ে ছিলেন। আর এবার তাঁর কোচিংয়ে আবারও আইসিসি খেতাব।
টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমেই ভারত বেদম প্রহারের পথেই হেঁটেছিল। আর সেই টোন সেট করে দিয়েছিলেন দুই ওপেনার- সঞ্জু স্যামসন ও অভিষেক শর্মা। ফাইনালের আগে ৭ ইনিংসে ৮৯ রান করা অভিষেক শর্মা কি আদৌ ফাইনালে থাকবেন, এই প্রশ্নেই ঝড় উঠেছিল ভারতীয় ক্রিকেটে। কিন্তু ফাইনালে ভারত দল অপরিবর্তিত রেখেই অভিষেকের উপর ফের একবার আস্থা রাখে। আর নির্বাচকদের ভরসার দাম দিলেন বিশ্বের এক নম্বর টি-২০ ব্যাটার। ৬ চার ও ৩ ছয়ে অভিষেক ২১ বলে বিধ্বংসী ৫২ রানের ইনিংস খেলে আউট হন। রাচিন রবীন্দ্রর প্রায় ওয়াইড বলে ব্যাট চালিয়ে টিম সেইফার্টের হাতে ক্যাচ তুলে দেন অভিষেক। ৭.১ ওভারে ৯৮ রান তুলে ভারত প্রথম উইকেট হারায়। প্রথম ৬ ওভারেই ভারত ৯২ রান তুলেছিল। চলতি বিশ্বকাপে পাওয়ারপ্লে-তে ওঠা এটাই সর্বাধিক রান। অভিষেক ফেরার পর তিনে নামেন ঈশান কিষান। এরপর তিনি আর সঞ্জু মিলে স্কোরবোর্ডে যোগ করেন ৪৮ বলে ১০৫ রান। ৫ চার ও ৮ ছয়ে ৪৬ বলে ৮৯ রান করে সঞ্জু ফেরেন মিস টাইমিং করে ক্যাচ আউট হয়ে। টানা তিন ম্যাচে দেশের জার্সিতে জ্বলে উঠে নিজের জাত চেনান তিনি। সঞ্জু যখন ফেরেন, তখন ভারতের স্কোর তখন দাঁড়ায় ১৫.১ ওভারে ২০৩ রান। সঞ্জুকে ফেরানোর চার বলের ভিতরেই নিশামের শিকার হন ঈশান। ফাইনালে ২৫ বলে ৫৪ রানের আগুনে ইনিংস খেলেন ‘পকেট-সাইজ ডায়নামাইট’।
পাঁচে নেমে সূর্যকুমার যাদব নিজের উইকেট ছুড়ে দিয়ে আসেন। নিশামের আউটসাইডের বল স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় পিক-আপ করতে গিয়ে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড স্কোয়ার লেগে রাচিনের হাতে ক্যাচ তুলে দেন তিনি। ফাইনালে অধিনায়কের থেকে যে শট ভাবাই যায় না। এরপর হার্দিক পাণ্ডিয়া ফেরেন ১৩ বলে ১৮ করে। ম্যাট হেনরির বলে তিনি স্যান্টনারের হাতে ধরা পড়ে যান। হার্দিক আরও কিছুক্ষণ ক্রিজে থাকবেন, তেমন আশাই ছিল সকল ভারতীয় সমর্থকের। কিন্তু না আজ হার্দিকও ফ্লপ। অভিষেক-সঞ্জু- ঈশান যেভাবে রকেটের গতিতে রান তুলতে শুরু করেছিলেন, তা কার্যত মালগাড়ির গতিতে নামিয়ে আনেন কিউয়ি বোলাররা। সূর্য-হাদিক ফেরার পরেই ভারতের রানের গতি একধাক্কায় পড়ে যায়। একসময়ে মনে হচ্ছিল ভারত আজ ৩০০ রান না করে ফেলে। সাতে নেমে শিবম দুবে ৮ বলে অপরাজিত ২৬ রানের ইনিংস খেলতে না-পারলে ভারতের রান ২৫০ টপকাত না। ৮ রানে অপরাজিত তিলক ভার্মাকে স্ট্রাইক না দেওয়ার কথা ভেবেই নিশামকে শেষ ওভারে অল আউট অ্যাটাকের কথা ভেবেছিলেন। আর সেটাই করেন তিনি। ৪-৬-৬-৪-৪ হাঁকান। শেষ ওভারে দুবে ২৪ রান যোগ করেন দুবে। ভারত নির্ধারিত ওভারে ৫ উইকেটে ২৫৫ তুলতে সমর্থ হয়। ২০-৩০ রান আরও হতেই পারত।
ভারতের রান তাড়া করতে নেমে নিউ জিল্যান্ড ৫ ওভারের ভিতরেই ৪৭ রানে তিন উইকেট হারিয়ে ফেলে। অর্শদীপ সিং এদিন শুরু করেন। তাঁর পঞ্চম ডেলিভারিতেই যদিও কিউয়িদের প্রথম উইকেট চলে আসছিল। কিন্তু মিড-অফে শিবম দুবে ফিন অ্যালেনের লোপ্পা ক্যাচ মিস করেন। যদিও তাঁকে ৯ রানে ফিরিয়ে দেন অক্ষর প্যাটেল। লং-অনে তুলে খেলতে গিয়ে অ্যালেন তিলক ভার্মার হাতে তুলে দেন। এরপর তিনে নামা রাচিন (১) ও চারে নামা গ্লেন ফিলিপস (৫) ফিরে যান। বুমরার শিকার হন রাচিন। ফিলিপকে তুলে নেন সেই অক্ষর।
এরপর ৯ ওভারের ভিতরে কিউয়িদের আরও ২ উইকেট চলে যায়। মার্ক চ্যাপম্যান (৩) ওপেনার সেইফার্ট (৫২) ফিরে যেতেই ভারত জয়ের গন্ধ পেতে শুরু করে দেয়। চ্যাপম্যানকে বোল্ড করে দেন পাণ্ডিয়া। ওদিকে সেইফার্ট বরুণ চক্রবর্তীর ঘূর্ণিতে পা দিয়ে ডিপ মিড উইকেটে তুলে খেলতে গিয়ে ঈশানের হাতে ক্যাচ তুলে দেন। ৯ ওভারে ৭২/৫ থেকে কিউয়িরা ১৯ ওভারে ১৫৯/১০ হয়ে যায়। সেইফার্টের পর অধিনায়ক স্যান্টনার (৪৩) লড়াই করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বাকি আর কারোর স্কোরই বলার বা লেখার মতো নয়। জসপ্রীত বুমরা ৪ উইকেট নিয়ে কিউয়ি কাঁটা পুরোপুরি উপড়ে ফেলে দেন। অক্ষর নেন তিন উইকেট। বরুণ-অভিষেক-হার্দিকের ঝুলিতে এসেছে এক উইকেট করে।