ফের টাকার চেহারা বদল

ডেস্ক: বছর দশেক আগে বদলে গিয়েছিল ভারতীয় টাকার চেহারা। চিরাচরিত ‘চাপা রং’ বদলে গিয়েছিল কমলা, গোলাপি, নীলের মতো উজ্জ্বল রংয়ে। একদশক পর ফের টাকার চেহারাবদলের ভাবনা। গত কয়েক বছরে নগদের চাহিদা যেভাবে বেড়েছে, তা সামাল দিতে এবার প্লাস্টিকের ব্যাঙ্কনোট ছাপার ভাবনা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের।
দিল্লি সূত্রে খবর, পটনা এবং মুম্বইয়ে আয়োজিত রিজার্ভ ব্যাঙ্কের শেষ দুই বোর্ড মিটিংয়ে প্লাস্টিক বা পলিমার ব্যাঙ্কনোট ছাপার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ব্যাঙ্কনোট ছাপার খরচ বাঁচানো অগ্রাধিকার পেয়েছে। পাশাপাশি, প্লাস্টিক যে দীর্ঘ সময় অক্ষত থাকে, সেকথা মাথায় রেখেই এমন সিদ্ধান্ত। শীঘ্রই এ নিয়ে ঘোষণা হতে পারে।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে ‘বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’ জানিয়েছে, কাগজের ব্যাঙ্কনোট ছাপার খরচের কথা যদি মাথায় রাখা হয়, সেক্ষেত্রে পলিমার ব্যাঙ্কনোট অনেক বেশি লাভজনক। ATMগুলিও পলিমার ভিত্তিক ব্যাঙ্কনোট বিতরণে সক্ষম হবে। বর্তমানে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সামর্থ্য় আছে ভারতের।
পলিমার নোট এক ধরনের বিশেষ প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি। এই ধরনের নোটকে প্লাস্টিক মানি বা প্লাস্টিক নোট বলা হয়। মূলত Biaxially Oriented Polypropylene সিন্থেটিক প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয় এক্ষেত্রে, যা পাতলা, স্বচ্ছ এবং নমনীয় শিট তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। স্বচ্ছ শিটের উপর রংয়ের প্রলেপ পড়ে। তার পর নকশা করা হয়। এই ধরনের নোট সহজে ছেঁড়ে না, জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে না।
হিসেব বলছে, ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে কাগজের ব্যাঙ্কনোট ছাপতে খরচ হয়েছে ৬৩৭২.৮ কোটি টাকা। ২০২৩-’২৪ অর্থবর্ষে খরচ হয় ৫১০১.৪ কোটি। ২০২৫ সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক যে রিপোর্ট দেয়, তাতে বলা হয়েছিল, চাহিদাবৃদ্ধির কারণেই নোট ছাপার খরচ বেড়ে গিয়েছে।
ব্যাঙ্কনোটের স্থায়িত্ব বৃদ্ধির জন্য় পলিমার ব্যবহার উচিত বলে মনে হয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের। কারণ যেমন তেমন ভাবে ব্যবহারের ফলে কাগজের ব্যাঙ্কনোট দ্রুত জরাজীর্ণ আকার ধারণ করে। সেগুলিকে বেশি মাত্রায় নষ্ট করা হয়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে ২৩৮০ কোটি জরাজীর্ণ কাগজের নোট বাতিল করতে হয়েছিল। ২০২৫ সালে সেই সংখ্য়া ছিল ২১২৪ কোটি, অর্থাৎ ১২.৩ শতাংশ বেশি জরাজীর্ণ নোট বাতিল করতে হয় ২০২৫ সালে। যে কাগজের নোট বাতিল করতে হয়, তার মধ্যে সিংহভাগই ছিল ৫০০ টাকার নোট। ১০০ টাকার নোট ছিল দ্বিতীয় স্থানে
এ থেকে আরও একটি বিষয় পরিষ্কার যে, যতই ডিজিটাল লেনদেনকে গুরুত্ব দেওয়া হোক না কেন, বাজারে নগদের চাহিদা কমার পরিবর্তে বেড়েছে। গত ১৫ মে পর্যন্ত বাজারে ৪,২৮৬,০০০ কোটির মুদ্রা রয়েছে, যা এখনও পর্যন্ত সর্বোচ্চ। ২০২৬-’২৭ অর্থবর্ষের প্রথম দেড় মাসেই বাজারে চালু মুদ্রার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ১১০০০০ কোটি। এতেই বোঝা যায়, ডিজিটাল লেনদেনের যুগেও নগদের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে উত্তরোত্তর। গত কয়েক বছরে বিশেষ করে ১০ টাকা, ২০ টাকার নোটের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও কম টাকার নোটের পরিমাণ সেই অর্থে বৃদ্ধি পায়নি। গত দু’বছরে বাজারে ১০ টাকার নোট ছিল মোটে ০.৭ শতাংশ, ২০ টাকার নোট ছিল ০.৮ শতাংশ। ১০ টাকা এবং ২০ টাকার কয়েনও চালু করেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। তবে কয়েনের ব্যবহার ততটাও বাড়েনি। ২০২৪ সালে ১২০ কোটি কয়েন সরবরাহ করা হয়েছিল। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয় ১৫০ কোটি। এর
তবে প্লাস্টিক বা পলিমারের নোট চালুর ভাবনা এই প্রথম নয়। ২০১২ সালে তদানীন্তন UPA সরকার পরীক্ষামূলক ভাবে পলিমার উপাদান দিয়ে তৈরি নোট চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। প্রথম ধাপে ১০০ কোটি ১০ টাকার পলিমার ভিত্তিক নোট চালুর ভাবনা গৃহীত হয়। তবে জাল নোট রুখতে নয়, টাকার স্থায়িত্ব বাড়াতেই ওই ভাবনা গৃহীত হয়। কিন্তু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার জেরে তার বাস্তবায়ন ঘটেনি সেই সময়। সময়ের সঙ্গে সেই প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা গিয়েছে। এখন ATM প্লাস্টিক বা পলিমারের নোট চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়ে উঠেছে।
পৃথিবীর ৬০টি দেশে পলিমার ভিত্তিক ব্যাঙ্কনোট চালু রয়েছে। ১৯৮৮ সালে অস্ট্রেলিয়াই প্রথম পলিমার ভিত্তিক নোট চালু করে। পরে সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, তাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া। ইউরোপে প্রথন পলিমার ভিত্তিক নোট চালু করে রোমানিয়া, ১৯৯৮ সালে। ২০১১ সালে ওই পথে হাঁটে কানাডা। আমেরিকার ডলার তৈরি হয় বিশেষ ধরনের কটন-লিনেনের মিশ্রণ দিয়ে। এবার ভারত পলিমার ভিত্তিক নোট চালুর কথা ভাবছে।

